মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় সোমবার রায়—ফাঁসির দাবি রাষ্ট্রপক্ষের; পলাতক হাসিনা আপিলের সুযোগ পাবেন না

Spread the love

ঢাকা, ১৭ নভেম্বর : বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা–র বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় রায় ঘোষণা করা হবে আগামী সোমবার। রায় দেবে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল, এবং বিশেষ পরিস্থিতির কারণে রায়ের সরাসরি সম্প্রচার করারও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে পরিচালিত অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্রপক্ষে ট্রাইব্যুনালের কাছে হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের আবেদন জানিয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা স্পষ্ট করে দিয়েছেন—ট্রাইব্যুনালের রায়ই চূড়ান্ত, এবং এই মামলার নিয়ম অনুযায়ী শেখ হাসিনা রায়ের বিরুদ্ধে কোনো আপিল বা আবেদন করতে পারবেন না। এই বিশেষ বিধি আদালতে ব্যাখ্যা করেছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী।

মামলায় হাসিনার বিরুদ্ধে মোট পাঁচটি অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযুক্তের তালিকায় আরও দুইজন—

  1. প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান
  2. বাংলাদেশ পুলিশের প্রাক্তন আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লা আল-মামুন

এর মধ্যে হাসিনা ও আসাদুজ্জামান দু’জনই পলাতক। সূত্রের দাবি—হাসিনার মতো আসাদুজ্জামানও ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন। অন্যদিকে, তৃতীয় অভিযুক্ত চৌধুরী আল-মামুনকে বাংলাদেশের পুলিশ গ্রেফতার করে এবং পরে তিনি রাজসাক্ষী হন। ট্রাইব্যুনালে দেওয়া তাঁর জবানবন্দিতে তিনি রাষ্ট্রপক্ষের দাবি সমর্থন করে জানিয়েছেন—শেখ হাসিনা মানবতাবিরোধী অপরাধে যুক্ত ছিলেন

রায় সামনে রেখে এখন উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে ঢাকাসহ গোটা বাংলাদেশে।

কী কী অভিযোগ

  • হাসিনার বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ, তিনি ২০২৪ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশে সরকারবিরোধী গণআন্দোলনের সময় ছাত্রযুবদের উপর পুলিশকে গুলি চালানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন। হেলিকপ্টার, ড্রোন এবং প্রাণঘাতী অস্ত্রপ্রয়োগ করে আন্দোলনকারীদের নির্মূল করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। দেড় হাজার মানুষকে হত্যার অভিযোগ তুলেছে রাষ্ট্রপক্ষ।
  • এ ছাড়া, উস্কানিমূলক ভাষণ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে হাসিনার বিরুদ্ধে। দাবি, বিভিন্ন সময়ে তাঁর বিভিন্ন মন্তব্যের কারণে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে গিয়েছে। ক্ষোভ বেড়েছে জনমানসে। সেই কারণেই ছাত্রযুবরা সরকারের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমেছিলেন।
  • রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদকে গুলি করে হত্যার ঘটনা আন্দোলনধ্বস্ত বাংলাদেশকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। আন্তর্জাতিক স্তরেও তার সমালোচনা হয়েছে। সেই হত্যার ঘটনাতেও অভিযুক্ত হাসিনা। অভিযোগ, তিনিই গুলির নির্দেশ দিয়েছিলেন।
  • ঢাকার চানখাঁরপুল এলাকায় আন্দোলনরত ছ’জনকে গুলি করে হত্যা করেছিল বাংলাদেশের পুলিশ। অভিযোগ, হাসিনাই সেখানে গুলি চালানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন। তিনি নির্দেশ না দিলে পুলিশ গুলি চালাত না।
  • গণআন্দোলন চলাকালীন আশুলিয়ায় ছ’জনকে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছিল। অভিযোগ, সেই নির্দেশও দিয়েছিলেন হাসিনা।

কেন আবেদন করা যাবে না

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী গাজি মোনাওয়ার জানিয়েছেন, হাসিনা পলাতক থাকায় তিনি ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে কোনও আবেদন জানাতে পারবেন না। সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা যায়। কিন্তু হাসিনা দেশে নেই। বাংলাদেশ পুলিশ এখনও তাঁকে হেফাজতে পায়নি। আইন বলছে, রায় ঘোষণার ৩০ দিনের মধ্যে তার বিরুদ্ধে আপিল করা যায়। কিন্তু আপিল করতে হলে অভিযুক্তকে আত্মসমর্পণ করতে হবে অথবা পুলিশকে তাঁকে গ্রেফতার করতে হবে। এ ক্ষেত্রে হাসিনা তাই আপিলের সুযোগ পাবেন না।

হাসিনা দেশের বাইরে থেকেই বেশ কয়েকটি সাক্ষাৎকারে দাবি করেছেন, জুলাই আন্দোলনে তিনি কাউকে সরাসরি হত্যার নির্দেশ দেননি। কিন্তু তাঁর এই বক্তব্য ট্রাইব্যুনালে গ্রহণযোগ্য নয়। আইনজীবী জানিয়েছেন, হাসিনা যদি সশরীরে আদালতে উপস্থিত হয়ে নিজের বক্তব্য জানাতেন, তা গ্রহণযোগ্য হত। কিন্তু পলাতক অবস্থায় গণমাধ্যমে তাঁর বক্তব্য আদালত গ্রাহ্য করতে পারে না। তা ছাড়া, হাসিনার কণ্ঠস্বরের রেকর্ড উন্মুক্ত আদালতে বাজিয়ে শোনানো হয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *